সোমবার,

২৪ জানুয়ারি ২০২২,

১০ মাঘ ১৪২৮

সোমবার,

২৪ জানুয়ারি ২০২২,

১০ মাঘ ১৪২৮

Radio Today News

ডিম পাড়ে হাঁসে, খায় বাগডাশে 

মেসবাহ শিমুল, সাংবাদিক 

প্রকাশিত: ১২:২৩, ১৪ জানুয়ারি ২০২২

আপডেট: ১২:৪৬, ১৪ জানুয়ারি ২০২২

ডিম পাড়ে হাঁসে, খায় বাগডাশে 

শতভাগ গ্রামের ছেলে আমি। যে সময়টায় আমাদের বেড়ে ওঠা সে সময়ের গ্রামগুলো ছিলো গ্রাম-বাংলার চিরায়ত প্রকৃতির আদি রূপ। আজ থেকে তিন দশক আগের আমাদের শৈশবের সঙ্গে এখনকার অনেক কিছুরই মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিকেল গড়ালেই বাড়ির পেছনের বাগান থেকে শেয়ালের দল হুক্কাহুয়া... ডেকে ডেকে অস্থির হয়ে যেতো। আমরা খেলাধুলা শেষ করে সন্ধ্যার আগেই ঘরে ঢুকে যেতাম। তার আগে মুরগীর খোপ, গরুর গোয়ালের দরজা ঠিকঠাকভাবে দেওয়া হয়েছে কি না তাও আবারো দেখে নিতাম। রাতে ঝোপ-জঙ্গল থেকে বাগডাশের ডাক ভেসে আসতো। প্রায় প্রতি রাতেই হয় কোনো না কোনো বাড়ির মুরগী নিয়ে গেছে, না হয় খোপের ফাঁক-ফোকর থেকে পা, ডানা টান দেওয়ার ঘটনা ঘটত। বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতো নরম পালক। ভয়ে মুরগীগুলো খোপের কোনে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকতো। হারিকেন কিংবা কুপির আলো নিয়ে সবাই ছুটে যেতো। পরদিন সকালে শুনতাম বাগডাশ হানা দিয়েছিলো রাতে। বাগডাসা বা বাগডাশ, অনেকটা হিং¯্র প্রকৃতির জন্তু। এটি ভিভেরিডি পরিবারের ভিভেরাগণের সবচেয়ে বড় আকারের একটি গন্ধগোকুল জাতীয় প্রাণী। 

দেশের কোথাও কোথাও প্রাণীটির অস্তিত্ব এখনো থাকলেও সেটি নিশ্চয়ই অনেক কম। বলা যায় এটি এখন প্রায় বিলুপ্ত প্রজাতীর একটি প্রাণী। তাই এ সপ্তাহের লেখার মাধ্যমে এই মাংসাশী প্রাণীটিকে খানিকটা পরিচয় করিয়ে দেবার চেষ্টা করছি। 

সম্প্রতি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটিতে একজন প্রবাসী বিমানবন্দরের বোডিং রুমের বাইরে মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছেন। বোর্ডিং ছাড় হওয়ার পর সেটি চুরি হয়ে যাওয়ায় অজ্ঞান হয়ে পড়েন তিনি। জীবনের সোনালী সময়টা প্রবাসে কাটিয়ে বাড়ি ফেরার সময় দেশের মাটিতে তার এই লাগেজ চুরি যাওয়ার বিষয়টিতে তিনি যে অসহায়ের মতো কান্নাকাটি করেছেন সেটি দেখে অনুমান করা যায় তিনি কতটা কষ্ট পেয়েছেন। 

রবিবার রাতে লেখাটি শুরু করার আগে ফেসবুকে ওই ভিডিওটি দেখতে আরো একটু ঘাটাঘাটি করছিলাম। তবে বেশিক্ষণ কষ্ট করতে হয়নি। এরমধ্যেই চোখে পড়লো একটি টেলিভিশনের প্রতিবেদন। যেখানে একজন চোরকে আটক করা হয়েছে। যে ইতোপূর্বে দিনেদুপুরে এমন অসংখ্য লাগেজ চুরি করে তার সোনারগাঁওয়ের বাড়িতে যথারীতি লাগেজ আর মালামালের শো’রুম বানিয়ে ফেলেছে। দামি-দামি সব জিনিসপত্র, মোবাইল, স্বর্ণালংকার কি নেই তার স্টকে। পুলিশ অবাক তার এই চোরাইপণ্য দেখে। পেশাদার ওই চোরের নাম আব্দুল কাদের। বিমানবন্দরে প্রবাস ফেরতদের লাগেজ চুরিই তার কাজ। এই কাজ তার পেশা ও নেশা। 

আমরা জাতিগতভাবে অনেকটা চোর শ্রেণিভুক্ত। চুরি আমাদের অস্থি-মজ্জা, রক্ত-মাংসে মিশে আছে অতিপ্রাচীন কাল থেকে। তাইতো আমাদের চোরের জাতিও বলা যায়। আমাদের রয়েছে চুরি করা অর্থনীতি, শিক্ষানীতি, সংস্কৃতি, রাজনীতি কিংবা সমাজ নীতি। যদিও একে অনেকে চুরি করা না বলে চাপিয়ে দেওয়া কিংবা ধার করাও বলে থাকেন। এদেশে ইমাম সাহেবরা খুৎবা চুরি করে। অধ্যাপকরা গবেষণা চুরি করে। ব্যবাসায়িরা সুনাম আর মুনাফা চুরি করে। চিকিৎসকরা রোগীর দুর্বলতা আর অসহায়ত্ব চুরি করে। প্রকৌশলীরা সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা চুরি করে। পুলিশ মানুষের আস্থা চুরি করে। আর রাজনীতিকরা চুরি করে জনগণের ভোট, গণতন্ত্র আর সুশাসন। এই সব চুরির মূল লক্ষ্যই নিজেদের শক্তিশালী করা। প্রত্যেকে প্রত্যেকের অবস্থান থেকে চুরি করে করে নিজেদের সুখী ভাবি আমরা। তবে এই মরিচিকার মতো সুখ শেষকালে আমাদের সুখী বানাতে পারে না। এগুলো আামদের রাতের ঘুম চুরি করে নেয়। মানসিকভাবে আমাদের চরমভাবে অসুখী করে তোলে। আমরা একটা চোরের জাতি হিসেবে নিজেদের অস্তিত্বকে বিলীন করে ফেলি। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে দেশ চালাতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তিনি বুঝে গিয়েছিলেন সত্যিকার্থে তিনি যে স্বপ্নের দেশ আর সোনার মানুষ চেয়েছিলেন তা তিনি পাননি। একদল চোর তাকে চারদিক থেকে বেস্টন করে রেখেছে। সেই উপলব্ধি থেকেই হয়তো সেদিন তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন ‘ সবাই পায় সোনার খনি, আর আমি পেয়েছি চোরের খনি’। 

বিমানবন্দরে টানা পার্টির দৌরাত্ব নতুন কোনো ঘটনা নয়। দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সংস্কৃতি। এই চোরদের ধরতে আর জনগণের নিরাপত্তা দিতে নিরাপত্তা বাহিনীরও অভাব নেই। তবে আমাদের দুর্ভাগ্য এই বিশেষ নিরাপত্তাকর্মীরাই বড় চোর। সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ-আনসার কিংবা অন্য যে কোনো বাহিনীর সদস্যই প্রবাসীদের কষ্টের টাকার জন্য লালায়িত। নানা অযুহাতে প্রকাশ্য ঘুষ, লাগেজ থেকে মালামাল হাতিয়ে নেওয়া, কিংবা পুরো লাগেজ সরিয়ে দেওয়ার কাজে অনেক সদস্যই বিভিন্ন সময় জড়িয়ে পড়ে বলে অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। তারওপর এইসব চোর সিন্ডকেটের সঙ্গেও এদের রয়েছে যোগসাজশ। মোটকথা এরা চোরে চোরে মাস্তুত ভাই। 

সোমবার সন্ধ্যায় কোনো একটা টেলিভিশনের খবর দেখছিলাম। সেখানে মালদ্বীপের প্রবাসীদের ওপরে করা একটি প্রতিবেদনে চোখ আটকে গেলো। সেখানকার প্রবাসীরা তাদের বঞ্চনা, অসহায়ত্বের কথা বলছেন। সেখানকার বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে তাদের কত অভিযোগ তা এই স্বল্প বিস্তর লেখায় তুলে ধরা সম্ভব নয়। তাদের ভাষায়, ‘কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের সঙ্গে কুকুরের মতো ব্যবহার করে। পদে পদে হয়রাণী আর দুর্নীতি’। এমন অভিযোগ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশের প্রায় সবগুলো দূতাবাস-হাইকমিশনের বিরুদ্ধে রয়েছে। 

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়তেই মূলত এইসব মিশন স্থাপন করা হয়ে থাকে। রাষ্ট্রদূতসহ দূতাবাস কর্মীদের এই বিশেষ নির্দেশনা দিয়েই সেখানে পাঠানো হয়। পাশাপাশি দেশটিতে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের সুবিধা-অসুবিধা দেখার দায়িত্বও তাদের। কিন্তু আফসোসের বিষয় বেশিরভাগ দূতাবাসেই প্রবাসীরা তাদের নূন্যতম সেবা পান না। কোনো কোনো সময় সেবা নিতে বাড়তি অর্থ প্রদানসহ নানা ধরণের হয়রাণীও পোহাতে হয় এসব অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত প্রবাসীদের। 

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী আয়ে বাংলাদেশ পৃথিবীর শীর্ষ ১০ দেশের একটি। বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, ১৯৭৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাজ করতে গেছেন। এ প্রবাসীরা মূলত স্বল্পশিক্ষিত। মূলত তারা গ্রামের বাসিন্দা। যারা গত সাড়ে চার দশকে ২ লাখ ১৭ হাজার মিলিয়ন ডলারের প্রবাসী আয় পাঠিয়েছেন। বছরে এখন তারা ১৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি প্রবাসী আয় পাঠাচ্ছেন। প্রবাসীদের প্রেরিত এ আয়ের কারণে নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যেই বেশ কয়েকটি নতুন রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, গেল ডিসেম্বর মাসে ১৬৪ কোটি ৯০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। ফলে সব মিলিয়ে সদ্য সমাপ্ত ২০২১ সালে বৈধ পথে ব্যাংকিং চ্যানেলে ২ হাজার ২০৭ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। দেশীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ এক লাখ ৮৯ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকার বেশি। যা ইতিহাসে একক বছরে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আহরণ। এর আগের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল ২০২০ সালে ২ হাজার ১৭৪ কোটি ডলার এবং ২০১৯ সালে এক হাজার ৮৩৩ কোটি ডলার। 
প্রবাসীদের নিয়ে লিখতে গেলে এমন অনেক কথাই লেখা যাবে। একদিকে দেশের প্রতি তাদের যেমন অবদানের সুস্পস্ট দলিল রয়েছে অন্যদিকে দেশের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি শোষণ কিংবা নির্যাতনের নজিরও রয়েছে। এইসব প্রবাসীরা আমাদের সম্পদ। আমাদের ডিম পাড়া হাঁস। কিন্তু দুর্ভাগ্য সেই ডিমগুলো বাগডাশে খেয়ে ফেলছে। একদিকে তাদের টাকায় ফুলেফেপে ওঠা অর্থনীতি শুষে খায় দেশের রাজনীতিক আর ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে বিমানবন্দরে তাদের লাগেজ টেনে নিয়ে যায় চোর সিন্ডিকেট। সবমিলে এই সোনার ডিম পাড়া হাঁসগুলোর জীবনের ষোলো আনাই যেন মিছে। জীবনের সবচেয়ে সোনালী সময়, যৌবনে পরিবার-পরিজন ছেড়ে প্রবাসে খেয়ে না খেয়ে অর্থ উপার্জন করলেও খুব কম লোকই সেই অর্থ ভোগ করতে পারে। তাদের নিগড়ে নেয়, পরিবার, সমাজ সর্বোপরি এই চোর বেস্টিত রাষ্ট্র ব্যবস্থা।  

লেখক: সাংবাদিক, কথাশিল্পী
 

রেডিওটুডে নিউজ/এমএস

সর্বশেষ

সর্বাধিক সবার কাছের